Tuesday, August 24, 2010

আবার দুই কোম্পানির লেনদেন স্থগিত হলো, ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড ও ফাইন ফুডস লিমিটেড

অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ার অভিযোগে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানির শেয়ার লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে। কোম্পানি দুটি হলো ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড ও ফাইন ফুডস লিমিটেড।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ গতকাল মঙ্গলবার লেনদেন চলাকালীন কোম্পানি দুটির লেনদেন স্থগিত করে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিএসই জানিয়েছে, কোম্পানি দুটির দাম বাড়ার কারণ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তের ফলাফল হাতে না পাওয়া পর্যন্ত লেনদেন বন্ধ থাকবে।
ডিএসইর এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইস্টার্ন হাউজিংয়ের শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণ জানতে কোম্পানির কাছে চিঠি দিয়েছিল। এর জবাবে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, দাম বাড়ার মতো কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য তাদের কাছে নেই। এরপরও দাম বাড়ায় গত সোমবার বেলা ১১টা ১২ মিনিটের সময় কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন ১৫ মিনিটের জন্য বন্ধ করে রাখা হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করার জন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তারপরও কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ায় বিনিয়োগকারীদের মঙ্গলের কথা মাথা রেখেই ইস্টার্ন হাউজিংয়ের শেয়ার লেনদেন গতকাল বেলা ১১টা ১৭ মিনিট থেকে আবারও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রায় একই রকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ফাইন ফুডসের ক্ষেত্রে। এ কোম্পানিটির পক্ষ থেকেও দাম বাড়ার পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য না থাকার কথা জানানো হয় ডিএসইকে। তারপরও শেয়ারটির দাম বাড়ছে। এ কারণে গতকাল বেলা ১১টা ৪৯ মিনিট থেকে ১৫ মিনিটের জন্য শেয়ার লেনদেন বন্ধ রাখা হয়। এরপরও দাম বাড়তে থাকলে দুপুর ১২টা ২৮ মিনিটে ফাইন ফুডসের শেয়ার লেনদেন আবারও স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় ডিএসই।
প্রায় এক মাস ধরে কোম্পানি দুটির শেয়ারের দাম টানা বেড়ে চলেছে। এর মধ্যে গত এক মাসে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৭২০ টাকা বা ১০৩ শতাংশ।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) অবশ্য ইতিমধ্যেই ইস্টার্ন হাউজিংয়ের শেয়ারের দাম বাড়ার কারণ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ডিএসইকে। একই সঙ্গে ৩১ আগস্টের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে এসইসির কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।
অন্যদিকে গত এক মাসে ফাইন ফুডসের শেয়ারের দাম ৫৫ থেকে বেড়ে ৯০ টাকা হয়েছে। এ সময় শেয়ারটির দাম বেড়েছে ৬৪ শতাংশের মতো। গতকাল লেনদেন শুরুর কিছু সময়ের মধ্যে শেয়ারটির দাম ছয় টাকা বেড়ে যায়।
ডিএসইর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১০ বছরে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের শেয়ারের বিপরীতে সর্বোচ্চ আয় (ইপিএস) ছিল গত বছর, যার পরিমাণ মাত্র ১৮ টাকা। আর কোম্পানিটি এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছে।
আর ১০ বছরে ফাইন ফুডস লভ্যাংশ দিয়েছে মাত্র চারবার। গত বছর কোম্পানিটি ১৫ শতাংশ হারে বোনাস দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে এ কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বাড়ার বিষয়ে বাজারে নানা গুজব শোনা যাচ্ছে। তবে কোম্পানির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি।

Shah Kabir, Financial Stock Analyst, DSE/ CSE/ LSE/ NYSE. Email: s.anaym@yahoo.com

শেয়ারে বিনিয়োগের জন্য ঋণের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হয়েছে এসইসি

শেয়ারে বিনিয়োগের জন্য ঋণের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। বাজারকে ঝুঁকিমুক্ত রাখার লক্ষ্যে অতিরিক্ত তারল্যপ্রবাহ কমাতেই এ কঠোরতা বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এসইসি বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শেয়ারবাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। এর সঙ্গে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর দেওয়া ঋণসুবিধা যুক্ত হওয়ায় তারল্যপ্রবাহ দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী শেয়ারের সরবরাহ না বাড়ায় তালিকাভুক্ত বিদ্যমান শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাজার দিনে দিনে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ কারণেই তারল্যপ্রবাহ কমাতে ঋণ বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় ২০০৬ সালের বিধান পরিপালনে কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ বিধানে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে তাদের গ্রাহকদের ঋণ দিতে গেলে নির্দিষ্ট সূত্র অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে। এ সূত্র অনুযায়ী, গ্রাহকদের শেয়ারের বাজারমূল্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রকৃত সম্পদমূল্য (এনএভি) যোগ করে দুই দিয়ে ভাগ করে যে ফল পাওয়া যাবে, সেই অনুপাতে ঋণ দিতে হবে। অর্থাৎ, কোনো শেয়ারের বাজারমূল্য এক হাজার টাকা ও এনএভি ৪০০ টাকা হলে শেয়ারটির ভিত্তিমূল্য ধরা হবে ৭০০ টাকা। এই ভিত্তিমূল্যের সমানুপাতিক হারে গ্রাহক ঋণসুবিধা পাবেন। কিন্তু বর্তমানে বাজারমূল্যের সমানুপাতিক হারেই ঋণ পাওয়া যায়। তার মানে নতুন নিয়মে গ্রাহক ৩০০ টাকা কম ঋণ পাবেন।
এসইসি বলছে, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঋণদাতা সব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা উভয় ক্ষেত্রেই এ সূত্র পরিপূর্ণভাবে মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ নতুন নিয়ম অনুযায়ী কোনো গ্রাহকের ঋণসীমা অতিক্রম করলে তা উল্লিখিত সময়ের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।
এসইসির বাজার পর্যালোচনা কমিটির সভায় গতকাল মঙ্গলবার এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আগামী রোববার আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এসইসি।
বৈঠক শেষে এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আনোয়ারুল কবীর ভূঁইয়া বলেন, ‘বাজারের বর্তমান অবস্থা নিয়ে এসইসি খুবই উদ্বিগ্ন। এ কারণে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ঋণ ব্যবস্থাপনা ও বিতরণের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের কঠোর অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
দীর্ঘদিন ধরে ঋণ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত এ বিধানটি বলবৎ থাকলেও প্রয়োগের ব্যাপারে সব সময়ই নমনীয়তা দেখিয়ে এসেছে এসইসি। এমনকি এ বিধানটি প্রয়োগের ব্যাপারে সংস্থাটি একেক সময় একেক ব্যাখ্যা হাজির করেছে। কখনো তারা বলেছে, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বিধানটি প্রযোজ্য হবে, কখনো আবার বলেছে ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। সর্বশেষ ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেই বিধানটি প্রয়োগের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো বিধানটি অনুসরণে আপত্তি জানায়। তাদের বক্তব্য ছিল, বিধানটি অনুসরণ করতে গেলে বাজার এক দিন কমলেই ঋণ সমন্বয়ের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে শেয়ার বিক্রি করে দিতে হবে। এ পরিস্থিতিতে আবারও শিথিলতা প্রদর্শন করা হয়েছিল।
এ ব্যাপারে আনোয়ারুল কবীর ভূঁইয়া বলেন, ‘সবই করা হয়েছে বাজারের অবস্থা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে।’ তিনি বলেন, মৌলভিত্তি ও নিজস্ব গতির পরিবর্তে বর্তমানে বাজার লাগামহীনভাবে বাড়ছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলকেই উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এসইসি বিধানটি কার্যকর করেছে।
যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি মার্চেন্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে যেসব কোম্পানির দাম বাড়ছে তার বেশির ভাগই ঋণের বাইরে রয়েছে। তাই এসইসির এ উদ্যোগ কতটুকু কার্যকর হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তিনি বলেন, ঋণপ্রবাহ কমাতে এসইসি যে সূত্র বেঁধে দিয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ এ নিয়মে কোনো কোম্পানির শেয়ারের বিপরীতে ঋণ দেওয়ার পরের দিনই দাম কমে গেলে, শেয়ারটি বাধ্যতামূলক বিক্রির তালিকায় পড়ে যায়। তাই সম্প্রতি এসইসির পরামর্শক কমিটির সভায় মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বিধানটি বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছিল। এ ব্যাপারে এসইসিও ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছিল।
হাবিবুর রহমান নামে একজন বিনিয়োগকারী বলেন, ‘আজকে (মঙ্গলবার) দাম বাড়ার শীর্ষ তালিকায় যেসব কোম্পানির নাম রয়েছে, তার প্রায় সবগুলো ঋণসুবিধার বাইরে রয়েছে। উল্টোদিকে যেসব কোম্পানিতে ঋণসুবিধা রয়েছে সেগুলোর বড় অংশই কমেছে। তার মানে ঋণসুবিধা কোনো সমস্যা নয়। বরং এ নিয়মের কারণে ঋণসুবিধার আওতায় তুলনামূলক ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির দাম কমবে। তাই এসইসির উচিত, ঋণসুবিধা না কমিয়ে দুর্বল ও স্বল্প মূলধনের কোম্পানির শেয়ার নিয়ে যে কারসাজি হচ্ছে, তা বন্ধ করা।’
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যেসব কোম্পানির বার্ষিক আয় অনুপাতে দাম (পিই) ৪০ গুণের বেশি, সেসব কোম্পানি ঋণসুবিধা পায় না। এ হিসাবে বর্তমানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শেয়ার ঋণসুবিধার বাইরে রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, অনেক মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউস এ নিয়ম ভেঙে বিশেষ বিশেষ গ্রাহকদের ঋণসুবিধা দিচ্ছে।
এ ব্যাপারে এসইসি বলছে, বিষয়টি তদন্ত করে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যারা এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যোগাযোগ করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ও ডিএসইর সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন আহমেদ খান বলেন, বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋণের রাশ টেনে ধরার দরকার ছিল। তবে এতে বাজার যাতে বেশি পড়ে না যায়, এসইসিকে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তিনি মনে করেন, ঋণসুবিধার ক্ষেত্রে এসইসির সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। বাজার কোন অবস্থায় গেলে কী ধরনের ঋণসুবিধা পাওয়া যাবে, আগে থেকে জানা থাকলে বিনিয়োগকারীরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে পারেন। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ মুহূর্তে বাজারে নতুন শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো দরকার।
সূত্রমতে, এসইসি কয়েক মাস ধরেই বাজারে তারল্যপ্রবাহ কমানোর চেষ্টা করে আসছে। আর এটা করতে গিয়ে তারা একেক সময় একেক ধরনের নীতি প্রণয়ন করছে। এতে কাজের কাজ তেমন কিছু না হলেও বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জুলাই বাজারের ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কোনো গ্রাহককে ১০ কোটি টাকার বেশি ঋণ না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি। এতে প্রথম প্রথম দু-এক দিন বাজার নিয়ন্ত্রণে ছিল ঠিকই। শেষ পর্যন্ত তা আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কারণ বিনিয়োগকারীদের একটা অংশ কৌশল পাল্টে স্বল্প মূলধনের ও ঋণসুবিধা-বহির্ভূত শেয়ারের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নগদ টাকায় লেনদেন হওয়ায় এসইসিরও তেমন কিছু করার থাকছে না।

Shah Kabir, Financial Stock Analyst, DSE/ CSE/ LSE/ NYSE. Email: s.anaym@yahoo.com